একদিকে ইরান যুদ্ধের কারণে বাড়ছে নিরাপত্তা ঝুঁকি। অন্যদিকে নিজ দেশে অর্থনৈতিক সংকট ও মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় দেশে ফিরতেও পারছেন না তারা। ফলে জীবনঝুঁকি নিয়েও অনেক শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যেই থেকে কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এমন বাস্তবতা উঠে এসেছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে। যুদ্ধ এখন জ্বালানি তেলের বাজার ছাড়িয়ে শ্রমিক, রেমিট্যান্স, মূল্যস্ফীতি ও দরিদ্র দেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে।
বাংলাদেশের শ্রমিক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুনের গল্প এ সংকটের প্রতীক হয়ে উঠেছে। প্রায় ১৫ বছর সৌদি আরবে কাজ করেছেন তিনি। বাড়িতে টাকা পাঠিয়ে পরিবার চালাতেন। চলতি বছর দেশে ফিরে স্থায়ীভাবে থাকার পরিকল্পনা করেছিলেন। নিজের সঞ্চয় দিয়ে বড় ঘর বানানোর স্বপ্নও ছিল তার। ছয় বছরের ছেলেকে তিনি জীবনে দেখেছেন মাত্র একবার।
কিন্তু সে স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। প্রায় দুই মাস আগে একটি ক্ষেপণাস্ত্র তার শ্রমিক ক্যাম্পে আঘাত হানে। এতে গুরুতর দগ্ধ হয়ে মারা যান আবদুল্লাহ। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে নিহত হওয়া বিদেশী শ্রমিকদের মধ্যে তিনি একজন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অনেক বেশি বিদেশী শ্রমিক নিহত হয়েছেন।
দীর্ঘদিন ধরেই উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি অনেকাংশে বিদেশী শ্রমিকনির্ভর। বাংলাদেশের মতো পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলংকাসহ অনেক দেশের অর্থনীতিতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা রেমিট্যান্স খুব গুরুত্বপূর্ণ। তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর আধুনিক অবকাঠামো, নির্মাণ খাত ও শিল্প-কারখানার বড় অংশই গড়ে উঠেছে এসব শ্রমিকের ঘাম ও শ্রমে। তবে তাদের বেশির ভাগই কম মজুরিতে কঠিন পরিবেশে কাজ করেন। অনেক ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও শ্রমিক অধিকার পান না তারা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, উপসাগরীয় অনেক দেশে জনসংখ্যার বড় অংশই অভিবাসী শ্রমিক। ব্যবসা ও আর্থিক খাতে পশ্চিমা নাগরিক, আরব ও ভারতীয়দের প্রাধান্য থাকলেও এশিয়া ও আফ্রিকার দরিদ্র দেশ থেকে যাওয়া শ্রমিকরা তীব্র গরমে নির্মাণ প্রকল্প, তেল স্থাপনা ও কারখানায় দীর্ঘ সময় কাজ করেন।
অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘কোয়ালিশন ফর লেবার জাস্টিস ফর মাইগ্র্যান্টস ইন দ্য গালফ’ বলছে, যুদ্ধের সময় অনেক শ্রমিকের আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। ফলে তারা বিভিন্ন এলাকায় আটকে পড়েন। সংগঠনটির হিসাবে, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলে অন্তত ২৪ বিদেশী শ্রমিক নিহত হয়েছেন। এছাড়া ইসরায়েলে নিহত হয়েছেন আরো চারজন। সমুদ্রে নিহত আট নাবিকও এ হিসাবের মধ্যে রয়েছে।
নর্দার্ন অ্যারিজোনা ইউনিভার্সিটির শ্রম ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞ উদয়া ওয়াগলে জানান, অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য পরিস্থিতি এখন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।
এদিকে এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। আলোচনা বারবার থেমে যাচ্ছে। ইরানও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। দেশটি বলছে, যুদ্ধ শেষ না হওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত এ পথ পুরোপুরি খুলবে না। যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে বেড়েছে গ্যাস, সার ও বিভিন্ন পণ্যের দাম। সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে এশিয়ার দেশগুলো। কারণ এসব দেশের অর্থনীতি অনেকাংশে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা রেমিট্যান্সও এসব দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে যাওয়া রেমিট্যান্স ভারতের মোট জিডিপির প্রায় ১ শতাংশের সমান। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলংকায় এ হার ৩-৫ শতাংশ ও নেপালে প্রায় ১০ শতাংশ। এখন বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বাড়ায় রেমিট্যান্সের গুরুত্ব আরো বেড়েছে।
তবে উপসাগরীয় অর্থনীতিও চাপের মুখে আছে। একদিকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় জ্বালানি স্থাপনার ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে রফতানি কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। ফলে নির্মাণ, আবাসনসহ বিভিন্ন খাতে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে বিদেশী শ্রমিকদের ওপর।
বাংলাদেশের উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসনবিষয়ক কর্মসূচির প্রধান শরিফুল ইসলাম হাসান এপিকে বলেন, ‘কম মজুরির শ্রমিকরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন। কারণ তারাই সবচেয়ে কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো করেন।’
যুদ্ধের কারণে আয় কমে যাওয়ার ঘটনাও বাড়ছে। কাতারে ট্যাক্সিচালক হিসেবে কাজ করা মিসরের নাগরিক আহমেদ আল-আলিলি জানান, গত দুই মাস তিনি পরিবারে টাকা পাঠাতে পারেননি। আগে মাসে প্রায় ৩ হাজার ডলার আয় করতেন। এখন তা এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। যুদ্ধের কারণে ভ্রমণ কমে যাওয়ায় আয়ও কমেছে।